দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সমুদ্রের গভীরে, মানুষের চোখের আড়ালে পড়ে আছে হাজার হাজার ব্যারেল। কয়েক দশক আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পারমাণবিক বর্জ্য ফেলে গিয়েছিল আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে। তখন ধারণা ছিল, গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে এবং আশপাশের পানিতে মিশে ছড়িয়ে পড়বে।
কিন্তু প্রায় অর্ধশতাব্দী পর বিজ্ঞানীরা সেখানে গিয়ে দেখলেন অন্য এক চিত্র। অনেক ব্যারেল ক্ষয়ে গেছে, মরিচা ধরেছে এবং কিছু ব্যারেল থেকে বর্জ্য আশপাশের সমুদ্রতলের বালিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
১৯৪৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ২ লাখের বেশি ব্যারেল নিম্নমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলে। এসব বর্জ্যের মোট পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি। বেশির ভাগ ব্যারেল ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার মিটার গভীরে ফেলা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন এসব ব্যারেলের সঠিক অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য ছিল না। কয়েক বছর আগে ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের পরমাণু প্রকৌশলী প্যাট্রিক শার্দোঁ এবং সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ হাভিয়ের এসকার্তাঁ জানতে আগ্রহী হন, এত বছর পর ওই বর্জ্যের কী অবস্থা হয়েছে।
সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় ‘নিউক্লিয়ার ওশান ডাম্প সাইট সার্ভে মনিটরিং’ বা নডসাম প্রকল্প। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, সমুদ্রবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও সামুদ্রিক রসায়নের গবেষকদের নিয়ে গঠিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বর্জ্যের ব্যারেলগুলো খুঁজে বের করা এবং আশপাশের পরিবেশে এর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না তা পরীক্ষা করা।
২০২৫ সালের জুনে গবেষণা জাহাজ ‘লাতালান্ত’ নিয়ে প্রথম অভিযান শুরু হয়। সমুদ্রতলের ওপর দিয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান ‘ইউলিক্স’ চালিয়ে ব্যারেলগুলোর অবস্থান শনাক্ত, মানচিত্র তৈরি ও ছবি তোলা হয়। একই সঙ্গে আশপাশের পানি, পলি, মাছ ও খোলসযুক্ত প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
মাত্র এক মাসে গবেষকেরা ৩ হাজার ৩৫৫টি ব্যারেল শনাক্ত ও মানচিত্রে চিহ্নিত করেন।
প্রথম অভিযানটি ছিল মূলত অনুসন্ধান। এবার গবেষকদের হাতে ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্য। তাই ২০২৬ সালের মে মাসে তারা আবার সমুদ্রে নামেন। এবার গবেষণা জাহাজ ‘পুকোয়া পা?’-এর সঙ্গে ছিল তিনজন বহনে সক্ষম ‘নটিল’ নামের একটি ডুবোজাহাজ, যা ৬ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত যেতে পারে।
২০টি অভিযানে ‘নটিল’ গবেষকদের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৭০০ মিটারের বেশি গভীরে নিয়ে যায়। সেখানে তারা ব্যারেলগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন এবং আশপাশের পরিবেশ থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেন।
ব্যারেলগুলোর অবস্থা দেখে প্রথমে গবেষকদের চোখে পড়ে ক্ষয় ও ধ্বংসের চিত্র। অনেক ব্যারেল ব্যাপকভাবে ক্ষয়ে গেছে এবং কিছু ব্যারেল থেকে পদার্থ বের হয়ে আশপাশের বালির ওপর ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
তবে সেখানেই আসে গবেষকদের জন্য অপ্রত্যাশিত একটি বিষয়।
ব্যারেলগুলো শুধু বর্জ্য বহনকারী পুরোনো পাত্র হয়ে থাকেনি। বরং সমুদ্রতলের প্রাণহীন বলে মনে হওয়া বালুময় পরিবেশে এগুলো এক ধরনের ছোট আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। ব্যারেলের গায়ে সামুদ্রিক অ্যানিমোনি লেগে ছিল। আশপাশে ছিল স্পঞ্জ, সামুদ্রিক শসা, মাছ ও বিভিন্ন খোলসযুক্ত প্রাণী। কাঁকড়াদেরও এসব কৃত্রিম আশ্রয়ের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ দেখা গেছে।
এতে গবেষকদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়। ব্যারেল থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বেরিয়ে থাকলে সেগুলো কি ব্যারেলের ওপর ও আশপাশে বসবাসকারী প্রাণীদের শরীরেও জমা হচ্ছে?
তেজস্ক্রিয় পদার্থ যে ব্যারেল থেকে বের হয়েছে, তার প্রমাণও মিলেছে। গবেষণা জাহাজে থাকা যন্ত্রে কোবাল্ট-৬০ ও নিওবিয়াম-৯৪-এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। গবেষকেরা এগুলোকে ফেলে দেওয়া তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে পেরেছেন।
এ ছাড়া সিজিয়াম-১৩৭ ও আমেরিসিয়াম-২৪১-এর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। এসবের মাত্রা বায়ুমণ্ডলীয় পারমাণবিক পরীক্ষা ও দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া স্বাভাবিক পটভূমি মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
তবে এই তেজস্ক্রিয়তা ব্যারেলগুলোর আশপাশে বসবাসকারী প্রাণীদের শরীরে জমা হচ্ছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।
‘নটিল’-এর মাধ্যমে পাঁচটি স্থানে ব্যারেলের একেবারে আশপাশ থেকে পলি, পানি, বিভিন্ন প্রাণী ও অণুজীবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকি ব্যারেলের সংস্পর্শে থাকা জায়গা থেকেও নমুনা নেওয়া হয়েছে। তুলনার জন্য কাছাকাছি পাথুরে আবাসস্থল থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
এসব নমুনা এখন বিশ্লেষণ করছেন গবেষকেরা। এর মাধ্যমে ব্যারেলগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অদ্ভুত আবাসস্থল সেখানকার প্রাণীদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে গবেষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তির তথ্যও রয়েছে। ডুবে যাওয়া সোভিয়েত সাবমেরিন ‘কমসোমোলেতস’ নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফুটো হয়ে যাওয়া চুল্লির আশপাশে তেজস্ক্রিয় পদার্থের মাত্রা স্বাভাবিক পটভূমির তুলনায় কয়েক লাখ গুণ বেশি হলেও মাত্র কয়েক মিটার দূরেই সেই মাত্রা দ্রুত কমে যায়। সমুদ্রের পানিতে পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার কারণে এমনটা ঘটে।
নডসাম দলের গবেষণাতেও দেখা গেছে, ব্যারেলগুলোর আশপাশে উল্লেখযোগ্য তেজস্ক্রিয়তার সংকেত থাকলেও নমুনা সংগ্রহকারী বিজ্ঞানীদের জন্য বড় ধরনের বিকিরণজনিত ঝুঁকি তৈরি করার মতো মাত্রা পাওয়া যায়নি। ‘নটিল’ এবং এর সঙ্গে থাকা যন্ত্রপাতিতেও দূষণের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ক্ষতিকর নয়। বরং প্রথমবারের মতো গবেষকদের হাতে এখন হাজার হাজার ব্যারেলের বিস্তারিত মানচিত্র এবং সেখান থেকে সংগৃহীত নমুনা রয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই বোঝা যাবে, কয়েক দশক আগে সমুদ্রের গভীরে ফেলে দেওয়া এই বিপুল বর্জ্য এখন সেখানকার পরিবেশ ও প্রাণিজগতের ওপর আসলে কী প্রভাব ফেলছে।
/অ